the glitch
[ben] অস্তিত্ব, ঈশ্বর, বাস্তবতা - 00
একটা স্বীকারোক্তি দিয়ে শুরু করি।
আমার মাথা খারাপ।
না মানে, সিরিয়াসলি। লোকে বলে। বাড়িতে বলে। বন্ধুরা বলে।
আমি দেশ বিদেশ ঘুরি। নিজের বিজনেস আছে। কাজ করি, বেশই করি, দিনে চোদ্দো পনেরো ঘণ্টা। সেটা সমস্যা না।
সমস্যা হলো কাজের মাঝখানে আমার মাথা চলে যায় অন্য জায়গায়। চেতনা কী। বাস্তবতা কী। আমরা আসলে কোথায় আছি। এই সব।
আমি জানি এটা একটা প্রিভিলেজ। বেশিরভাগ মানুষের এসব ভাবার সময় নেই। দিন চলে যায় চালাতে চালাতে। আমি কোনোভাবে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঢোকার জায়গা পেয়েছে। সেটা ভাগ্য, সেটা পরিস্থিতি, যাই বলো।
কিন্তু ছোটবেলা থেকে একটা সমস্যা ছিল। আমি কিছু মুখের উপর মেনে নিতে পারি না। কেউ বলল এটা এরকম, আমার প্রথম প্রশ্ন কেন। কেউ বলল এটা সত্য, আমার প্রশ্ন কে বলেছে, কীভাবে জানলো। বিশ্বাস করতে পারি না চোখ বুজে। কোনোদিন পারিনি।
তো এই যা লিখছি, এটা কোনো উপদেশ না। এটা আমার নিজের খোঁজ। একটা তদন্ত বলতে পারো। অনেকদিন ধরে যা নিয়ে ভাবছি, যা খুঁজছি, সেটা গুছিয়ে লেখার চেষ্টা।
তো সেই মাথা খারাপ জায়গা থেকে লিখছি।
ছোটবেলায় দিদিমা বলতেন সন্ধ্যায় নখ কাটতে নেই।
আমি বললাম কেন?
উনি বললেন লক্ষ্মী চলে যান।
আমি ভাবলাম লক্ষ্মীর কী উইকনেস যে নখ কাটলেই পালান। মানে উনি তো দেবী। থাকলেই পারেন। কিন্তু না, নখ কাটার শব্দ শুনলেই বলেন “আচ্ছা বাবা, আমি গেলাম।”
অনেক বছর পর বুঝলাম আসল ব্যাপার।
আগে সন্ধ্যায় আলো ছিল না। হারিকেন ছিল। কম আলোয় নখ কাটতে গেলে আঙুল কাটা যায়। কেউ তো আর বলবে না “বাছা, আলো কম, হাত কেটে যেতে পারে।” সেটা বোরিং। ভয় লাগে না। তাই বলা হলো লক্ষ্মী চলে যাবেন।
ব্রিলিয়ান্ট প্যাকেজিং। কাজ হয়ে গেল।
সমস্যা কোথায় জানো?
এখন ঘরে LED আছে। ফোনে ফ্ল্যাশলাইট আছে। ইচ্ছা করলে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে নখ কাটতে পারো।
তবু লোকে বলে সন্ধ্যায় কাটতে নেই।
কেন?
কারণ কেউ জিজ্ঞেস করে না। শুধু মানে। অথবা মানে না। দুই ক্যাম্পে ভাগ হয়ে যায়। এক দল বলে “শাস্ত্রে আছে, মানতে হবে।” আরেক দল বলে “সব বাজে কথা, কিচ্ছু নেই।”
দুই দলের কেউ থামে না ভাবতে যে হয়তো একটা কারণ ছিল, সেটা এখন আর নেই, কিন্তু খোলসটা রয়ে গেছে।
এটা শুধু নখের ব্যাপার হলে কথা ছিল না।
সমস্যা হলো এভাবেই আমরা প্রায় সবকিছু পড়ি।
গীতা। বাইবেল। কোরান। বেদ। যা খুশি নাও।
হাজার হাজার বছর আগে কিছু মানুষ কিছু দেখেছিল। কী দেখেছিল সেটা শব্দে পুরো বলা যায় না। তাই গল্প বলেছিল। রূপক বলেছিল। কবিতা লিখেছিল।
তারপর সেই গল্প হাত বদল হলো। কয়েক হাজার বছর ধরে। প্রতিটা হাত বদলে একটু একটু করে আসল অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে গেল। এখন আমাদের হাতে আছে সেই গল্পের গল্পের গল্পের ফটোকপির ফটোকপি।
আর আমরা সেই নিয়ে মারামারি করছি।
মন্দির সঠিক না মসজিদ। পুজো ঠিক না নামাজ। কৃষ্ণ বড় না আল্লাহ।
ভাই, দুটোই আঙুল। চাঁদের দিকে তাকাও না একবার।
আমি ধার্মিক না। নাস্তিকও না।
আমি একটু অন্যরকম জীব। ইংরেজিতে বলে সাইকোনট। মানে যে মাথার ভেতরে ঘুরতে যায়। চেতনার গভীরে ডুব দেয়। দেখে আসে ওপারে কী আছে।
গেছি। দেখেছি। কিছু জিনিস দেখেছি যা শব্দে বলা শক্ত।
কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার হয়েছে। সব ঐতিহ্য, সব ধর্ম, সব দর্শন শেষমেশ একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। মোড়ক আলাদা। ভেতরের মাল এক।
তাহলে এত তর্ক কীসের? মোড়কের। প্যাকেজিং এর। কে কোন ভাষায় বলেছে তার।
তো আমি ভাবলাম লিখি।
না, তোমাকে নতুন ধর্ম দেব না। চিন্তা করো না। নতুন গুরু হওয়ার ইচ্ছাও নেই। গুরু হলে সকালে উঠতে হয়, সাদা কাপড় পরতে হয়, গুরুগম্ভীর গলায় কথা বলতে হয়। অত কষ্ট করার মন নেই।
আমি শুধু কিছু ফাটল দেখাতে চাই।
বাস্তবতার ফাটল। তোমার চেনা জিনিসের ফাটল। সেই ফাটল দিয়ে হয়তো একটু অন্য আলো ঢুকবে।
তারপর তুমি কী করো সেটা তোমার ব্যাপার। আমি জাস্ট গ্লিচটা দেখাব।
আট সপ্তাহ। আটটা চিঠি।
এক। শব্দের সমস্যা। একই শব্দ বলে দুজন কেন আলাদা জিনিস বোঝে।
দুই। মানচিত্র ও ভূখণ্ড। তোমার বিশ্বাস দেশ না, ম্যাপ।
তিন। তিনটে প্রশ্ন। অস্তিত্ব, জ্ঞান, আচার। গুলিয়ে ফেললে মুশকিল।
চার। অভিজ্ঞতা ও কাঠামো। কেউ কিছু দেখেছিল। তারপর মন্দির উঠেছে।
পাঁচ। রেন্ডারিং। তুমি যা দেখ সেটা যা আছে তা না।
ছয়। চেতনা মূলে। জড় আগে না মন আগে?
সাত। আত্মার নাবিক। আমি কী, যদি ধার্মিকও না, নাস্তিকও না।
আট। পুরো ছবিটা।
শোনো, এটা পড়ে আরাম লাগবে না।
যা জানো তা নড়ে যাবে। যা বিশ্বাস করো তা প্রশ্নে পড়বে। একটু অস্বস্তি হবে।
কিন্তু তুমি এটা পড়ছো মানে তোমারও মাথায় একটু গোলমাল আছে। ভালো মানুষ হলে এতক্ষণে স্ক্রল করে চলে যেতে।
তো থাকো। আমরা একসাথে গোলমালটা বুঝে দেখি।
পরের সপ্তাহে প্রথম চিঠি।
The Glitch। চলছে।


